১০ এপ্রিল সন্ধ্যার পর আর ফেরেননি মিরাজ, সামনে এল নানা প্রশ্ন


Desk News প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১২, ২০২৬, ৯:২৩ অপরাহ্ন /
১০ এপ্রিল সন্ধ্যার পর আর ফেরেননি মিরাজ, সামনে এল নানা প্রশ্ন

মোংলা প্রতিনিধি

১০ এপ্রিল সন্ধ্যা। মোংলার জয়মনির ঘোলের বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি মিরাজ শেখ। এরপর কেটে গেছে চার মাস। পরিবারের অভিযোগ, সাদাপোশাকে থাকা কোস্টগার্ডের সদস্যরা তাঁকে তুলে নিয়ে গেছেন। পরে বলা হয়, মান্নান মাঝির জালি বোটে করে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোস্টগার্ড বলছে, মিরাজকে তারা আটক বা গ্রেপ্তার করেনি। যে বোটটির কথা বলা হয়েছে, সেই বোটের মাঝিও দাবি করছেন, তাঁর বোটে মিরাজকে নেওয়া হয়নি।
এর মধ্যেই আত্মসমর্পণকারী সাবেক জলদস্যু নেতা সুমন হাওলাদারের একটি বক্তব্য নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাঁর দাবি, মিরাজের সঙ্গে সুন্দরবনের দস্যুদের যোগাযোগ ছিল। এমনকি মিরাজ নিখোঁজ হওয়ার দিনই তাঁর মাধ্যমে সাড়ে ৬ লাখ টাকা পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। সুমনের এই বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা অবশ্য এখনো নিশ্চিত হয়নি।
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে মোংলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে মিরাজের বোন দাবি করেন, কোস্টগার্ডের সদস্যরা মান্নান মাঝির জালি বোটে করে মিরাজকে নিয়ে যান।

মান্নান মাঝি এ দাবি অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মিরাজ নিখোঁজ হওয়ার সময় তিনি জালি বোটে করে জাহাজে লোক আনা-নেওয়ার কাজে ছিলেন। তাঁর বোটে মিরাজকে তোলা বা নিয়ে যাওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। সরকারি লোকজনের নিজেদের বোট থাকতে তাঁর বোটে করে কাউকে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নও ওঠে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নাজমুলও মিরাজকে তুলে নেওয়ার ঘটনা নিজ চোখে দেখেননি। তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই বিষয়টি শুনেছেন। তাঁর প্রশ্ন, পরিবারের দাবি অনুযায়ী যদি মিরাজকে সবার সামনে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ঘটনাস্থলে থাকা কেউ অন্তত একটি ছবি বা ভিডিও ধারণ করলেন না কেন।
নাজমুল মিরাজের জীবনযাপন নিয়েও একটি পর্যবেক্ষণের কথা জানান। তাঁর ভাষ্য, মিরাজের পরিবার আর্থিকভাবে খুব স্বচ্ছল ছিল না। কিন্তু মিরাজের চলাফেরা ও জীবনযাপন দেখে অনেক সময় তা বোঝা যেত না। তাঁর ওঠাবসা ও চলাফেরা ছিল বেশ স্বচ্ছন্দ। এ নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা ছিল বলেও জানান তিনি। মিরাজ দস্যু সুমন বাহিনীর সোর্স ছিল বলেও জানান তিনি

পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে কোস্টগার্ডের বক্তব্য ভিন্ন। বিসিজি বেইজ মোংলার নির্বাহী কর্মকর্তা কমান্ডার শহীদ আল আহসান (এনডি), পিএসসি, বিএন বলেন, মিরাজকে কোস্টগার্ড আটক বা গ্রেপ্তার করেনি। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে কোস্টগার্ডের কোনো সংশ্লিষ্টতাও নেই।
কোস্টগার্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিরাজের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
ফলে পরিবারের অভিযোগের বিপরীতে কোস্টগার্ডের বক্তব্য হলো, মিরাজ তাঁদের হেফাজতে ছিলেন না এবং তাঁকে আটক করার কোনো ঘটনা ঘটেনি।

মিরাজ ও সুমন হাওলাদার একই এলাকার বাসিন্দা এবং তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে স্থানীয় কয়েকজন জানিয়েছেন। সুন্দরবনে জলদস্যু হিসেবে সক্রিয় থাকা সুমন পরে কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে সুমন দাবি করেন, সুন্দরবনের দস্যুদের সঙ্গে মিরাজের যোগাযোগ ছিল। জেলের ছদ্মবেশে নৌকায় করে সুন্দরবনের গহিনে যাতায়াত করতেন মিরাজ। দস্যুদের কাছে অস্ত্র ও রসদ পৌঁছে দেওয়ার কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করেন সুমন।

সুমনের বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ সাড়ে ৬ লাখ টাকা নিয়ে। তাঁর দাবি, সুন্দরবনের একটি জেলে বহরকে জিম্মি করে জলদস্যুরা মুক্তিপণ দাবি করেছিল। সেই মুক্তিপণের সাড়ে ৬ লাখ টাকা মিরাজের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল ১০ এপ্রিল।

মিরাজও নিখোঁজ হন ওই দিন।

দুটি ঘটনার সময়ের এই মিলই এখন নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। মিরাজ কি ওই টাকা পৌঁছে দিতে কোথাও গিয়েছিলেন? টাকাটি কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল? তাঁর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে ওই টাকার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

এদকে,মিরাজকে খুঁজে বের করার বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। তাঁর বাবা মোস্তফা শেখ হাইকোর্টে রিট করলে ১২ জুলাই আদালত মিরাজকে উদ্ধার করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি।

মিরাজের নিখোঁজের ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দ্রুত তদন্ত ও মিরাজের সন্ধান নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রও মিরাজকে দ্রুত খুঁজে বের করা এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

এসব সংগঠনের বক্তব্য অবশ্য মিরাজকে কারা নিখোঁজ করেছে, তা প্রমাণ করে না। তারা মূলত ঘটনার কার্যকর ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার জানিয়েছেন, মিরাজের নিখোঁজের ঘটনায় করা সাধারণ ডায়েরির তদন্ত চলছে। তবে এখন পর্যন্ত মিরাজকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এখন তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ১০ এপ্রিলের সেই সন্ধ্যা। মিরাজ কোথা থেকে বেরিয়েছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তাঁর মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান কোথায় ছিল, মান্নানের জালি বোট তখন কোথায় ছিল, কারা তাঁকে শেষবার দেখেছিলেন এবং সুমনের দাবি করা সাড়ে ৬ লাখ টাকার সঙ্গে মিরাজের কোনো যোগাযোগ ছিল কি না—এসব তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

একদিকে পরিবারের অভিযোগ, অন্যদিকে কোস্টগার্ডের অস্বীকার। পরিবারের দাবি করা জালি বোটের মাঝি বলছেন, মিরাজ তাঁর বোটে ওঠেননি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও তাঁকে তুলে নেওয়ার ঘটনা দেখেননি। আবার আত্মসমর্পণকারী সাবেক জলদস্যু নেতার বক্তব্যে উঠে এসেছে মিরাজের কথিত দস্যু-যোগ ও নিখোঁজের দিনের সাড়ে ৬ লাখ টাকার প্রসঙ্গ।
চার মাস পরও তাই মিরাজের নিখোঁজের রহস্যের উত্তর মেলেনি।

১০ এপ্রিল সন্ধ্যার পর মিরাজ কোথায় গেলেন, সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছে তাঁর পরিবার, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সবাই।