শুল্ক ফাঁকির আখড়ায় বেনাপোল বন্দর, নিয়ন্ত্রণ করছে শুল্ক ফাঁকিবাজ ও চোরাচালানিরা।


Milon Hossain প্রকাশের সময় : জুন ২৮, ২০২৬, ৯:০৭ অপরাহ্ন /
শুল্ক ফাঁকির আখড়ায় বেনাপোল বন্দর, নিয়ন্ত্রণ করছে শুল্ক ফাঁকিবাজ ও চোরাচালানিরা।

মিলন হোসেন বেনাপোল প্রতিনিধি,

দেশের বৃহত্তম বেনাপোল স্থলবন্দর নিয়ন্ত্রণ করছে শুল্ক ফাঁকিবাজ আর চোরাচালানিরা। একের পর এক পণ্যচালান আটক, লোপাট ও উধাও হওয়া এবং কর্মকর্তাদের যোগসাজশ প্রমাণ করছে যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে বন্দর ও কাস্টমস। কাগজপত্রবিহীন পণ্যচালান পাচার, পণ্য চুরি, অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষ বা বাণিজ্যে লিপ্ত কর্মকর্তাদের নীলনকশায় শুল্ক ফাঁকির লুটের রাজত্বে পরিণত হয়েছে বেনাপোল বন্দর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি কয়েকটি পণ্য চুরি ও লোপাটের ঘটনায় কাস্টমস বাদী হয়ে তিনটি মামলা করেছে। এসব মামলায় বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারী এবং আমদানিকারকসহ মোট ৪৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে জড়িত থাকায় ৯টি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত হয়েছে। তবে কাস্টমসের মামলায় কোনো আসামিকে এখন পর্যন্ত আটক করতে পারেনি পোর্ট থানা পুলিশ।
অভিযোগ রয়েছে, গত ২১ জুন (রবিব-ার) রাতে বিজিবির অভিযানে ঢাকা মেট্রো-ট ২৪-৫৬২১ নং ট্রাকসহ পৌনে ৩ কোটি টাকার শাড়ি ও কসমেটিক্স চালানসহ কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শ্রী ইন্দ্রজিৎকে হাতেনাতে আটকের পর বেরিয়ে আসছে একের পর এক শুল্ক ফাঁকির অপকর্ম। এ ঘটনায় জড়িত দুই রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিন সিপাইকে বহিষ্কার করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। তবে ওই রাতে কাস্টমস গোডাউনের আরেক ট্রাকে বিপুল পরিমাণ বস্তা পণ্য লোড করে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) আরিফুল ইসলাম চৌধুরী ও সিপাই সাগর।
অদৃশ্য কারণে ওই ট্রাক কাস্টম হাউজ থেকে বের না করে পণ্য আনলোড করে নেওয়া হয়। ওই ট্রাকটির দায়িত্বে থাকা কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) আরিফুল ইসলাম চৌধুরীকে সাসপেন্ড করা হলেও তাকে পুলিশে সোপর্দ করেনি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ দৃশ্যমান বিষয়টি জানার পরও কাস্টম হাউজের কমিশনার ফাইজুর রহমান ও জয়েন্ট কমিশনার সাঈদ আহমেদ রুবেল অদৃশ্য কারণে সাসপেন্ড ও বদলি করেই দায় সেরেছেন। শেড থেকে পণ্য চুরিতে যদি শেড ইনচার্জ, আমদানিকারক এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের নামে মামলা হয়, তাহলে রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) আরিফুল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে কেন মামলা হবে না এমন প্রশ্ন বন্দরজুড়ে। অভিযোগ উঠেছে, এসব চুরি, অনিয়ম-দুর্নীতি এবং ঘুষ বাণিজ্যের সাথে গোপনে কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িত এবং এসব অবৈধ কাজের লেনদেনের টাকা ঢাকায় পেমেন্ট হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৪ ডিসেম্বর (২০২৫) রাতে কাস্টমস গোডাউন কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম চৌধুরী কয়েক বস্তা কসমেটিক্স পণ্য ও প্রাইভেটকারসহ দীঘিরপাড় নামক স্থানে বিজিবির হাতে আটক হন। তবে সে যাত্রায় কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে ছাড় পেলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। একই সাথে আটক পণ্যের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কাস্টমসের শীর্ষ কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও নজরদারির অভাবে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এদিকে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাত ৯টার দিকে বন্দরের ৩২ নম্বর শেড ইয়ার্ড থেকে একটি ট্রাক জব্দ করেছে কাস্টমস। কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, আমদানিকারক মেসার্স আরাফ এন্টারপ্রাইজের নামে সরিষার খৈলবাহী ট্রাক (নং-ডব্লিউবি-২৫কে-৮৪১৫) গত ২৩ জুন রাত ৯টায় বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করে। পরে ২৫ জুন ট্রাকটি ৩৩ নম্বর শেডে পণ্য খালাস করে। এরপর বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বন্দরের ৩২ নম্বর ইয়ার্ড এলাকায় প্রবেশ করলে বন্দর কর্তৃপক্ষ ট্রাকটি আটকায়।
পরে কাস্টমসকে অবহিত করলে বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কাস্টমার কমিশনার অটল গোস্বামীর উপস্থিতিতে ট্রাকটি তল্লাশি করা হয়। এ সময় ট্রাক থেকে ১৪০ বস্তা খৈল ও ৫০টি খালি বস্তা জব্দ করা হয়। জব্দকৃত পণ্যের মোট ওজন ৭ হাজার ১৫৭ কেজি এবং খৈলের নিট ওজন ৬ হাজার ৯১৩ কেজি পাওয়া গেছে। বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার অটল গোস্বামী জানান, ঘোষণাপত্র অনুযায়ী ট্রাকটিতে ১০ টন ৯০ কেজি পণ্য থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে পাওয়া গেছে ৬ টন ৯১৩ কেজি। ফলে ঘোষিত পরিমাণের তুলনায় ৩ হাজার ১৭৭ কেজি খৈলের ঘাটতি পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে খালি ৫০ বস্তায় অন্য কোনো পণ্য ছিল, যা শেডে ঢোকার আগে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রে উঠে এসেছে, পণ্য পাচারের সাথে বেনাপোলের আলোচিত শুল্ক ফাঁকির

চক্রের সাথে জড়িত  সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মেসার্স প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল। সর্বশেষ সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে ৩২ নম্বর শেড থেকে খৈলের চালানে থাকা মালামালসহ ঢাকা মেট্রো-ট-২২-২১৭৮ ট্রাকটি জব্দ করে থানায় সোপর্দ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
তবে কাগজপত্রবিহীন কী পণ্য ছিল তা নিয়ে বন্দর এলাকায় জল্পনা-কল্পনা চলছে। কেউ বলছেন মাদক, কসমেটিক্স বা আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধের চালান ছিল। এদিকে আটক চালক ইব্রাহিম জানিয়েছে, সে বন্দরের ৩২ নম্বর শেড থেকে পণ্য লোড দিয়ে ঢাকায় নামিয়ে দিয়েছে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, সিসিটিভি ফুটেজে প্রমাণ হওয়াতে শেড ইনচার্জসহ জড়িতরা উক্ত পণ্যচালান বেনাপোল ও যশোরের কোনো গোডাউনে রেখে চালক ও হেলপারসহ ট্রাকটি বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে সোপর্দ করেছে। তাহলে লোপাট করা পণ্যচালানে কী পণ্য ছিল, তা নিয়ে বেঁধেছে নানান প্রশ্ন। অনেকে বলছেন, সেখানে কয়েক কোটি টাকার পণ্য ছিল।

অভিযোগ উঠেছে, কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) মাইদুল ইসলাম-১ ও বন্দরের কর্মকর্তাদের বিশেষ চুক্তিতে এই চক্রের নো-এন্ট্রির পণ্যচালান, ঘোষণা বহির্ভূত ও ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্যচালান ছেড়ে দেওয়া হয়। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে তিনটি পণ্যচালান পাচার করে নিয়ে গেছে কয়েক কোটি টাকার এই চক্র এবং তিনটি চালানে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের অভিমত, বন্দরে সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও রাতের আঁধারে বা বিশেষ ইয়ার্ড থেকে পণ্য পাচার হচ্ছে। দিনের বেলায়ও কাস্টমস এবং বন্দরের একশ্রেণীর কর্মকর্তার সহযোগিতায় বন্দর শেড থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার পণ্য। আবার বৈধভাবে আনা পণ্য শুল্ক না দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে হামেশাই। এমনকি বন্দরের হেফাজতে রাখা আটক পণ্য সরিয়ে সেখানে নিম্নমানের পণ্য রাখার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাও ঘটেছে। কঠোর অবস্থানের কথা বলছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, কিন্তু বাস্তবে কিছুই ঠিক করতে পারছে না। এনবিআর-এর হস্তক্ষেপসহ কাস্টমস ও বন্দরের ভেতরে সিসিটিভি নজরদারি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারসহ অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। তা না হলে বেনাপোল বন্দরের ভঙ্গুর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে রাজস্ব আদায়ে ধস।