
ফাহিম হোসেন রিজু
ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের বিরামপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মো. রাব্বির মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নই চুরমার হয়নি, অন্ধকার নেমে এসেছে ৭ মাস বয়সী এক দুধের শিশুর জীবনে। নাম তার ইসরাত জাহান আলেয়া। যে বয়সে বাবার আঙুল ধরে হাঁটা শেখার কথা, সেই বয়সেই সে চিরতরে হারাল তার মাথার ওপরের ছায়া।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) চারপাশটা জুমার নামাজের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। ঠিক তখনই বিরামপুর টিএন্ডটি অফিসের সামনে ঘাতক ট্রাক কেড়ে নিয়েছে রাব্বির প্রাণ। কিন্তু রাব্বির মৃত্যুর চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়িয়েছে তার শিশুকন্যা আলেয়া। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার বুলাকীপুর ইউনিয়নের শালিকাদহ গ্রামের তহিদুল ইসলামের ছেলে রাব্বি (৩৪) তার কন্যাকে নিয়ে হয়তো অনেক স্বপ্ন বুনেছিলেন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা সেই সব স্বপ্নে চিরতরে জল ঢেলে দিল।
রাব্বি ও তার বন্ধু সজিব যখন মোটরসাইকেলে করে বাড়ির পথে ফিরছিলেন, তখন হয়তো রাব্বির ব্যাগে ছিল ছোট্ট আলেয়ার জন্য কোনো বায়না, কিংবা মনে ছিল বাড়ি ফিরে মেয়েকে বুকে টেনে নেওয়ার আকুতি। কিন্তু সেই সুযোগ আর দিল না বেপরোয়া গতির একটি ট্রাক।
শুক্রবার শালিকাদহ গ্রামে রাব্বির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস। অথচ ছোট্ট আলেয়া তখনো জানে না তার বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। হয়তো ক্ষুধার যন্ত্রণায় কিংবা কান্নার রোলে সে-ও কেঁদে উঠছে, কিন্তু যার কোলে চড়ে শান্ত হওয়ার কথা ছিল, সেই মানুষটি তখন কাফনের কাপড়ে মোড়া।
গ্রামে এখন একটাই আলোচনা—বড় হয়ে যখন আলেয়া বুঝতে শিখবে, তখন সে কাকে ‘বাবা’ বলে ডাকবে? বাবার স্নেহের স্পর্শ কি কেবল ফ্রেমবন্দি ছবিতেই খুঁজে নিতে হবে তাকে?
পরিবারের এক সদস্য অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, “আলেয়া যখন বড় হয়ে জিজ্ঞেস করবে—’আমার বাবা কেমন ছিলেন?’, তখন আমরা তাকে ছবি দেখাব, গল্প শোনাব। কিন্তু বাবার সেই পাহারাদারের মতো বুকটা তো আর ফিরে পাব না।”
রাব্বি ও তার বন্ধু সজিবের এমন অকাল মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়রা ঘাতক ট্রাকচালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। তবে শাস্তি হলেও আলেয়ার জীবনের এই বিশাল শূন্যতা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে যখন দেশজুড়ে সোচ্চার মানুষ, তখন আলেয়ার মতো শিশুদের এই নিঃস্ব হওয়ার গল্পগুলো কেবল দীর্ঘশ্বাসই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন :