ঘোড়াঘাট একসময়ের জেলা, কালের বিবর্তনে এখন অবহেলিত উপজেলা


Desk News প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ২৪, ২০২৬, ৪:০৩ অপরাহ্ন /
ঘোড়াঘাট একসময়ের জেলা, কালের বিবর্তনে এখন অবহেলিত উপজেলা

ফাহিম হোসেন রিজু
ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ভরপুর ঘোড়াঘাট একসময় ছিল প্রাচীন বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। প্রশাসনিক কার্যক্রম, রাজনীতি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও সংস্কৃতিতে একসময় এই এলাকা ছিল সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই গৌরবময় অতীত আজ হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এখন ঘোড়াঘাট একটি অবহেলিত উপজেলা হিসেবে টিকে আছে উত্তরবঙ্গের মানচিত্রে।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মোগল আমলে ঘোড়াঘাট ছিল একটি সমৃদ্ধ প্রশাসনিক কেন্দ্র। এখানেই ছিল ‘ঘোড়াঘাট জেলা সদর’, যেখানে তৎকালীন সময়ের কর আদায়, রাজস্ব সংগ্রহ ও সামরিক নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। আজও এর নিদর্শন হিসেবে ঘোড়াঘাটে রয়েছে পুরনো দুর্গ, মসজিদ, রাজবাড়ি ও প্রশাসনিক স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ।

স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, ঘোড়াঘাটের নামকরণও ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখানে একসময় ছিল মোগল সৈন্যদের ঘোড়ার বিশ্রাম ও রক্ষণাবেক্ষণের কেন্দ্র। সেখান থেকেই নাম হয় ঘোড়াঘাট।

কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে এই ঐতিহাসিক এলাকার প্রতি প্রশাসনের নজর কমতে থাকে। উন্নয়ন প্রকল্পে উপেক্ষিত, অবকাঠামো অনুন্নত, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বিনিয়োগ কম ফলে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে ঘোড়াঘাট। বর্তমানে এখানকার রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো নানা সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত।

ঘোড়াঘাট উপজেলা ৪ টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার নিয়ে গঠিত। ঘোড়াঘাট উপজেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৮৪,২৭৯ জন। পুরুষ: প্রায় ৫১.৭৭% এবং মহিলা: প্রায় ৪৮.২৩% এবং আয়তন: প্রায় ১৪৮.৬৭ বর্গ কিলোমিটার।

জেলা হতে উপজেলার দূরত্ব : দিনাজপুর জেলা সদর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত ঘোড়াঘাট উপজেলা-এর দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। রংপুর বিভাগের দিনাজপুর জেলা সদর থেকে সড়কপথে বেশ দূরবর্তী অবস্থানে অবস্থিত। সাধারণত বাসে বা নিজস্ব যানবাহনে দিনাজপুর শহর থেকে ঘোড়াঘাট পৌঁছাতে প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লেগে থাকে।

ঘোড়াঘাট থানা : যা ১৯১৬ সালে ২ একর ২৭ শতাংশ জায়গা নিয়ে স্থাপিত হয়। ১৯৮৬ সালে ২১ লক্ষ ১৬ হাজার ৪০০ টাকা বরাদ্দদিয়ে একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। যা ছাদের প্লাস্টার খুলে পড়ছে ভবনের অনেক জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। ছাদ চুয়ে পানি পরা বর্ষাকালীন নিত্যদিনের ঘটনা। কিছু কিছু পুলিশ সদস্য ছাদে পলিথিন ব্যবহার করছে। থানার অভ্যন্তরে অনেক জায়গা পরিত্যক্ত হিসেবে পড়ে থাকলেও নেই এসআই কোয়াটার, মহিলা পুলিশ সদস্যদের জন্য কোয়াটার। দেশের অনেক থানা আধুনিক মডেল ভবনের ছোঁয়া পেলেও এই থানা এখনো পাই নাই। যারা সারাদিন নিরাপত্তা দিতে ব্যস্ত তারাই রাতে নিরাপত্তাহীনতায় ঘুমাই।

ডাকবাংলো : ঘোড়াঘাট উপজেলায় নেই কোন সরকারি বা বেসরকারি আবাসন স্থল আছে জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত একটি ডাকবাংলো । বেশির ভাগ সময় অতিথরা আসলে ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাদের আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে।

কলেজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা : এই উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৭০–৮০ টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ২৫–৩০ ও ডিগ্রি কলেজ সংখ্যা প্রায় ২–৩ টি। শিক্ষার মান উন্নয়নে অনেকটা পিছিয়ে এই উপজেলার মানুষ। উচ্চ ডিগ্রি নিতে অন্যান্য জেলা শহরে কলেজে ভর্তি হতে হয় । উপজেলা পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় হলে উচ্চশিক্ষার জন্য দূরের শহরে যেতে হবে না। গ্রাম পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও সহজে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে।
নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়বে। থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতের খরচ কম হবে। পরিবার থেকে দূরে থাকার ঝামেলা কমবে। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র করে স্থানীয় চাকরি ও ব্যবসা বাড়বে। যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাসস্থান, বাজার ও অন্যান্য অবকাঠামোর উন্নয়ন হবে। এলাকার শিক্ষার মান ও সামাজিক সচেতনতা বাড়বে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স : ১৯৬৫ সালে ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে ৩১ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে পরিচালিত হলেও ২০১৮ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্বোধন করা হয়।
মূলত ঘোড়াঘাট উপজেলার জনগণের জন্য স্থাপিত উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল। তবে বাস্তবে ঘোড়াঘাট ছাড়াও আশেপাশের এলাকা দিনাজপুর-৬ আসনের আশেপাশের গ্রাম ও সীমান্তবর্তী ৪-৫ টি উপজেলার এলাকার মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে।
প্রতিদিন প্রায় ৬০০–৮০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে হাসপাতাল প্রশাসনিকভাবে উন্নতকরণ করা হলেও বাস্তব চিত্র আলাদা, ডাক্তার সংকট, পরিছন্নতা কর্মীর সংকট এতে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ এবং সেবা দিতে হিমশিম খেতে হয় কর্তব্যরত চিকিৎসকদের।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, ঘোড়াঘাট শুধু একটি উপজেলা নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অধ্যায়। সরকারের উচিত এই ঐতিহাসিক স্থানটির উন্নয়নে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা। ঘোড়াঘাটের ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পর্যটন উন্নয়ন, এবং প্রাচীন স্থাপনাগুলোর সংস্কার করলে এ উপজেলা আবারও অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রাণ ফিরে পেতে পারে। কালের সাক্ষী ঘোড়াঘাট আজও নীরবে বলে যাচ্ছে তার অতীতের গৌরবের কথা কিন্তু এখন প্রয়োজন সেই ইতিহাসকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা।