
জিয়াউল ইসলাম জিয়া বিশেষ প্রতিনিধি :
সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর ও বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের অনেক নারীর জীবনে ঈদের আনন্দ যেন বহু আগেই ম্লান হয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে তারা পরিচিত ‘বাঘ-বিধবা’ নামে।★
এই নারীদের স্বামীরা জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া কিংবা মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন। ★
অনেক ‘বাঘ-বিধবা’ পরিবার এখনও সরকারি তালিকাভুক্ত নয়। ফলে তারা নিয়মিত কোনো ভাতা বা সহায়তা পান না। ★
ঈদ মানেই আনন্দ, নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবার আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। কিন্তু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক নারীর কাছে ঈদ মানে কেবলই বেদনা, অভাব আর প্রিয়জন হারানোর স্মৃতি। সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর ও বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের অনেক নারীর জীবনে ঈদের আনন্দ যেন বহু আগেই ম্লান হয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে তারা পরিচিত ‘বাঘ-বিধবা’ নামে।
এই নারীদের স্বামীরা জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া কিংবা মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুতে একদিকে যেমন পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারাতে হয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা সংকটও নেমে এসেছে তাদের জীবনে। বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বাসিন্দা রিজিয়া বেগম বলেন, “আগে ঈদ এলে ঘরে খুশির আমেজ থাকত। এখন ঈদ এলেই কষ্টটাই বেশি মনে হয়। কোনো রকমে সংসার চালাই, ঈদের আনন্দ করার সামর্থ্য নেই।” একই এলাকার তৈয়েবা খাতুন বলেন, স্বামী হারানোর পর জীবন পুরো বদলে গেছে। প্রতিদিনই সংগ্রাম করতে হয়। ঈদের সময় অন্যদের আনন্দ দেখলে নিজের কষ্টটা আরও বেশি অনুভূত হয়। তিনি বলেন, “ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু করতে না পারলে খুব খারাপ লাগে।”
গাবুরা ইউনিয়নের সাথী আক্তার বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের পুরো দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়েছে। কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করেন, কখনো ধার করে দিন চালান। “ঈদের দিনেও আমাদের জন্য আলাদা কিছু থাকে না। তবুও বাচ্চাদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করি,” বলেন তিনি।
একই ইউনিয়নের কুলসুমের কথায়ও একই বেদনা। তিনি বলেন, “ঈদ এলে মনে হয় আমরা যেন এই আনন্দের বাইরে পড়ে আছি। ছেলেমেয়েদের নতুন কাপড় কিনে দিতে পারি না, ভালো খাবারের ব্যবস্থাও করতে পারি না।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক ‘বাঘ-বিধবা’ পরিবার এখনও সরকারি তালিকাভুক্ত নয়। ফলে তারা নিয়মিত কোনো ভাতা বা সহায়তা পান না। কেউ কেউ অল্পস্বল্প সহায়তার ওপর নির্ভর করে কোনোমতে জীবন চালাচ্ছেন। আবার সামাজিক কুসংস্কারের কারণেও অনেক সময় এসব নারী অবহেলার শিকার হন।
সাতক্ষীরার সাংসদ গাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, উপকূলীয় এলাকায় মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ, মাছ ধরা ও কাঠ সংগ্রহের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যান। এতে প্রায়ই বাঘের আক্রমণে পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য মারা যান। এই ধরনের নারীদের স্থানীয়ভাবে “বাঘ বিধবা” বলা হয় এবং তারা আর্থিকভাবে অসহায় হয়ে পড়েন। তিনি মনে করেন, বাঘ বিধবাদের জন্য বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ভাতা চালু করা উচিত। অতীতে সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এই উদ্দেশ্যে একটি প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে তার প্রত্যাশা, উপকূলীয় এলাকার বাস্তবতা বিবেচনায় এই উদ্যোগ পুনরায় নেওয়া হবে এবং বাঘ বিধবাদের সন্তানদের শিক্ষা, পুনর্বাসন ও জীবিকা নিশ্চিত করা হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় থাকা পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, যাতে তারা আর্থিক ও সামাজিকভাবে নিরাপদ থাকে।
আপনার মতামত লিখুন :