
ফাহিম হোসেন রিজু
ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:
ভোরের প্রথম আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে করতোয়া নদীর তীরে। নদীর বাতাসে আজও যেন ভেসে আসে বহু শতাব্দী আগের কোনো রাজকীয় ইতিহাসের ফিসফিসানি। চোখ বন্ধ করলেই কল্পনায় ভেসে ওঠে অশ্বারোহী সৈন্যদের পদচারণা, রাজকীয় নৌবহরের আনাগোনা, ব্যস্ত বন্দর, বণিকদের কাফেলা আর দুর্গের প্রহরীদের সতর্ক দৃষ্টি। সময় বদলেছে, নদীর গতিপথও পাল্টেছে; কিন্তু দিনাজপুরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের শান্ত, সবুজ জনপদ ঘোড়াঘাট আজও নীরবে বহন করে চলেছে হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবের স্মৃতি।
আজকের যে শান্ত ও কৃষিনির্ভর ঘোড়াঘাট, তার মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে এক সমৃদ্ধ অতীত। একসময় এটি কোনো সাধারণ জনপদ ছিল না; বরং উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। করতোয়া নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল এই জনপদের সমৃদ্ধি, যা একসময় উত্তরাঞ্চলের ক্ষমতা ও অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
ইতিহাসের পাতা জানায়, প্রাচীনকালে এই অঞ্চল প্রাগজ্যোতিষপুর বা কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মহাভারতের যুগে এটি পরাক্রমশালী রাজা ভগদত্তের শাসনাধীন ছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীকালে পাল ও সেন শাসকেরা এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব উপলব্ধি করে এখানে প্রশাসনিক ও সামরিক অবস্থান সুদৃঢ় করেন। চারদিকে বিস্তৃত বনাঞ্চল, করতোয়ার প্রবাহ আর সামরিক তৎপরতায় মুখর ছিল সেই সময়ের ঘোড়াঘাট।
১২০৫ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। তবে ঘোড়াঘাটের প্রকৃত বিকাশ ঘটে সুলতানি ও মোগল আমলে। সম্রাট আকবরের শাসনামলে এটি ‘সরকার-এ-ঘোড়াঘাট’ নামে উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক এককে পরিণত হয়। এখান থেকেই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের রাজস্ব আদায়, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সামরিক তৎপরতা পরিচালিত হতো। ১৫৭৬ সালে মোগলদের দখলের পর এর গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, মীর জুমলার মতো খ্যাতিমান মোগল ফৌজদাররাও এখান থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভ করলে মোগল শাসনের অবসান ঘটে এবং এই অঞ্চলেও ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব বিস্তার শুরু হয়।
‘ঘোড়াঘাট’ নামটির উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে ইতিহাস ও জনশ্রুতির মিশেল। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, মোগল আমলে মধ্য এশিয়া ও পারস্যসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উন্নত জাতের যুদ্ধের ঘোড়া করতোয়া নদীপথে এখানে আনা হতো। নদীর ঘাটে ঘোড়াগুলো নামিয়ে গোসল করানো, পরিচর্যা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। পাশাপাশি বসত বিশাল ঘোড়ার বাজার। সেই ‘ঘোড়ার ঘাট’ নামটিই লোকমুখে ধীরে ধীরে রূপ নেয় ‘ঘোড়াঘাট’-এ। যদিও এ বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে, তবুও স্থানীয় মানুষের বিশ্বাসে এই ইতিহাস আজও জীবন্ত।
একসময় ঘোড়াঘাট বিখ্যাত ছিল তিনটি ‘ব’-এর জন্য— বন্দর, বাজার ও বীরত্ব। করতোয়া নদী তখন আজকের মতো ক্ষীণধারা ছিল না; এটি ছিল উত্তরবঙ্গের প্রাণশিরা এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ঢাকা, মুর্শিদাবাদসহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বড় বড় বাণিজ্যিক নৌযান ও পণ্যবাহী জাহাজ এসে ভিড়ত এই নদীবন্দরে। ঘোড়া কেনাবেচার পাশাপাশি সূক্ষ্ম রেশম, মসলিন ও অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্যও জমজমাট ছিল। এই জনপদ ছিল উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
সামরিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্বের পাশাপাশি ঘোড়াঘাট ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও সমৃদ্ধ। সুফি সাধক হযরত শাহ ইসমাইল গাজী (রহ.)-এর ইসলাম প্রচারের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই অঞ্চল। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত মাজার আজও ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
প্রাচীন ঘোড়াঘাট দুর্গ আজও অতীতের গৌরবের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুর্গের প্রতিটি ইট যেন ইতিহাসের একেকটি অধ্যায়ের কথা বলে। এর পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন সুরা মসজিদ, রহস্যঘেরা বারপাইকের গড়সহ বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন। সুরা মসজিদকে ঘিরে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে নানা কিংবদন্তি—অনেকে বলেন, এটি নাকি এক রাতেই জ্বিনেরা নির্মাণ করেছিল। ইতিহাস ও লোকবিশ্বাস মিলিয়ে এসব স্থাপনা আজও কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এসব ঐতিহাসিক স্থান দেখতে ঘোড়াঘাটে আসেন।
সময়ের পরিবর্তনে করতোয়া নদী তার আগের নাব্যতা ও যৌবন হারিয়েছে। মোগলদের দুর্গ, বিশাল ঘোড়ার বাজার কিংবা ব্যস্ত নদীবন্দরের সেই জৌলুসও আর নেই। তবে ঘোড়াঘাটের গুরুত্ব কমে যায়নি; বরং নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে এই জনপদ।
যেখানে একসময় ঘোড়ার খুরের শব্দে মুখর থাকত চারপাশ, সেখানে আজ বাতাসে দোলে সবুজ ধানক্ষেত। অতীতের সামরিক শক্তির জায়গা নিয়েছে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। ধান, আলু, ভুট্টা, গম, সরিষা, পেঁয়াজ, রসুন ও মৌসুমি সবজির উৎপাদনে ঘোড়াঘাট উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। উপজেলার উর্বর জমিতে উৎপাদিত কৃষিপণ্য প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
ফলের উৎপাদনেও রয়েছে বিশেষ সুনাম। ঘোড়াঘাটের লিচুবাগান দিনাজপুরের বিখ্যাত লিচুর ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। পাশাপাশি হাঁড়িভাঙা, আশ্বিনা, ল্যাংড়াসহ বিভিন্ন জাতের আমও এখানকার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রানীগঞ্জসহ স্থানীয় পাইকারি বাজার থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক কৃষিপণ্য রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। কৃষকের ঘামে উৎপাদিত এই ফসল শুধু স্থানীয় অর্থনীতিকেই সচল রাখছে না, দেশের খাদ্য সরবরাহেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও ঘোড়াঘাটের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। দিনাজপুর, হিলি স্থলবন্দর, গাইবান্ধা, রংপুর ও বগুড়ার সংযোগস্থলে এবং জাতীয় মহাসড়কের ওপর অবস্থান হওয়ায় এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী যানবাহন এই পথ ব্যবহার করে। সীমান্তবর্তী এলাকার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের কারণে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডও সম্প্রসারিত হচ্ছে।
ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্মীয় ঐতিহ্য, কৃষির সমৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য সমন্বয় থাকা সত্ত্বেও জাতীয় পর্যায়ে ঘোড়াঘাট এখনও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে কাঙ্ক্ষিত পরিচিতি পায়নি। পর্যাপ্ত অবকাঠামো, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ, তথ্যসমৃদ্ধ নির্দেশনা, গবেষণা এবং কার্যকর প্রচারণার অভাব দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে ঘোড়াঘাট উত্তরবঙ্গের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এতে যেমন সংরক্ষিত হবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ও প্রত্নসম্পদ, তেমনি সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান, বিকশিত হবে পর্যটনশিল্প এবং আরও শক্তিশালী হবে স্থানীয় অর্থনীতি।
রাজা-বাদশাহদের শাসনের অবসান হয়েছে, মোগল দুর্গের অনেক অংশ আজ ইতিহাসের স্তরে চাপা পড়েছে, করতোয়া নদীও হারিয়েছে তার প্রাচীন প্রমত্ত রূপ। তবুও ঘোড়াঘাট তার পরিচয় হারায়নি। বরং অতীতের রাজকীয় ঐতিহ্য, শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, কৃষির সাফল্য, যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্ব এবং পর্যটনের অপার সম্ভাবনাকে একসঙ্গে ধারণ করে নতুন সময়ের পথে এগিয়ে চলেছে।
ঘোড়াঘাট শুধু একটি উপজেলা নয়; এটি উত্তরবঙ্গের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী, ঐতিহ্যের ধারক, কৃষির প্রাণকেন্দ্র এবং সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল নাম। সময় এসেছে, দেশের মানচিত্রে এই প্রাচীন জনপদকে তার প্রাপ্য মর্যাদায় নতুনভাবে তুলে ধরার—যাতে আগামী প্রজন্ম শুধু ইতিহাসের বইয়ে নয়, বাস্তবেও অনুভব করতে পারে করতোয়ার তীরে গড়ে ওঠা এক রাজকীয় সভ্যতার স্পন্দন।
আপনার মতামত লিখুন :